শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

টুনটুন টুনটুনি

আনোয়ার আল ফারুক 

মা টুনটুনিকে এই কয়দিন ছানাদের খাবারের জন্য খানিক দূরে যেতে হচ্ছে। বাসার পাশেই শীতকালীন সবজির বেশ কয়টা বাগান থাকলেও বাগানের মালিকরা বাগানের নিরাপত্তার প্রশ্নে বাগানের উপরে ও চারপাশে জাল বেঁধে দিয়েছে। বাগানে পর্যাপ্ত পরিমাণ পোকা মাকড়ের আনাগোনা থাকলেও মা টুনটুনি এসব বাগানে জাল বেষ্টনির কারণে ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই দূর থেকে আহার এনে ছানাদের খাওয়াচ্ছে। তবে মা টুনটুনি সারাদিন দূর থেকে খাবার আনতে গিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন  থাকে। না জানি কাক কিংবা কোন হিংস্র পাখি ছানাদের উপর অযাচিত আক্রমণ করে বসে কিনা? মায়ের মন বলে কথা। মায়েরাতো বাচ্চাদের নিয়ে সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন সময় কাটান। ইদানিং ছানা দুটোও বেশ পাকনামি শুরু করছে। সময় অসময় বাসা থেকে উঁকিঝুঁকি দেয়, সুযোগ পেলেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। এই নিয়ে মা টুনটুনির চিন্তারও শেষ নেই। ইদানিং বকাঝকা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। ওরা সুযোগ পেলেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। পড়ন্ত বিকেল। চারিদিকে শুনশান নিরবতা। এই নিরবতা অবশ্যই অন্য সময়ের চেয়ে আজ খানিক বেশি। মা টুনটুনিকে এক্ষুণি খাবারের জন্য বের হতে হবে। বের হবার আগে ছানা দুটোকে যথাসাধ্য বুঝিয়ে শুনিয়ে বাসায় রেখে যায়। মা টুনটুনি বুঝাতে চেষ্টা করছে তোমরা বাসায় থাকলে নিরাপদ থাকবে আর আমিও অন্তত দুশ্চিন্তামুক্তভাবে তোমাদের আহার জোগাড় করতে পারব। অন্যদিকে এই ছানাদের বাবা থাকে সুদুর প্রবাসে। কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটলে ওদের বাবার কাছে কী জবাব দেবে? তখনতো যত দোষ সব বর্তাবে মায়ের উপর। মায়ের গাফলতিকে বড় করে দেখবে। ছানাদের দাদি চাচা ফুফি সবাই তখন মাকে দোষারোপ করবে। এসব বলে কয়ে মা টুনটুনি পূর্ব দিগন্তে উড়াল দিল। আশপাশ উঁকিঝুঁকি দিয়ে ছানা দুটোও ঠিকই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল। ওড়ে গিয়ে বসল কাঁঠাল গাছের ঝরাপাতা মগডালে। ছানা দুটো গল্পে মশগুল। ধীরলয়ে একটা পাতি কাক এসে বসল ঠিক ওদের থেকে খানিক পিছনে আরেকটা মরা ডালে। ক্ষণিকেই লোভি পাতি কাক ঝাপটে পড়ল টুনটুনি ছানাদের উপর। টুনটুনি ছানারা চিৎকার তুলে ফুড়ুত করেই বাসায় ঢুকে পড়ল। পাতি কাক ওদের গতিবিধি খেয়াল করতে পারেনি বলে এই দফায় ওরা বেঁচে গেল। ততক্ষণে মা টুনটুনি খাবার মুখে বাসায় ঢুকল কিন্তু ছানাদের খাবার গ্রহণে কোন আগ্রহই দেখল না। অন্যদিকে ছানাদের চোখ মুখও সাংঘাতিক ধরণের ভয়ার্ত ভাব। মা টুনটুনি খাবার পাশে রেখে ওদের ভয়ের কারণ জানতে চাইলে ছানাদের একজন কথা বলতে যেয়েও শুধু ম্যাও ম্যাও করছে। মা ধমক দিয়ে বলছে কী বিড়াল ছানার মতো ম্যাও ম্যাও করছিস ক্যান? কী হয়েছে খুলে বল। তখন অন্য ছানাটি বলল কা.. কা.. কা..। আবার কী হয়েছে কাকের ছানার মতো কা কা করছিস ক্যান? তখন সেই ছানাটি আবার বলল কাক। মা টুনটুনি বলল কী কাক এসেছে বাসায়? না, বাসায় না। তইলে? ওই যে কাঁঠাল গাছের ডালে। তার মানে তোমরা বাসা থেকে বেরিয়ে ওই কাঁঠাল ডালে গিয়ে বসছ? ছানা দুটো মাথা নাড়ে৷ ততক্ষণেও তাদের ভয় কাটেনি। শোন, তোমাদের দস্যিপনা আমাকেও বিপদে ফেলবে। তোমাদের কিছু হলে তোমাদের বাবার কাছে আমি কী জবাব দেব? কথা না শুনলে কাকের আধার হয়ে কাকের পেটে ঢুকতে হবে। মায়ের মুখে এমন কথা শুনে ওদের ফুসফুস শুকিয়ে যেন চৈত্রের কাঠফাটা রোদের কবলে পড়া মাঠের মতো হয়ে গেল। দুজনেই অনুতাপ স্বরে বলল মা-মণি আর জীবনেও বাসা থেকে বের হব না। মা হেসে উঠল আর বলল তাহলে তোমাদের খাওয়াবে কে? কেন তুমি আছ না। আমিতো আর চিরকাল থাকব না। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় আর জীবনযুদ্ধে হিসেব করেই চলতে হবে। না, মা-মণি আমরা আর কখনো বাসা থেকে বের হব না। পঁচা কাক আমাদের বারবিকিউ বানিয়ে খেয়ে ফেলবে। ভয় পেলে জয় করবে কীভাবে? কালই আমরা বাসা ছেড়ে ওড়াল দেব বলল মা টুনটুনি। তাহলে আমরা কোথায় থাকব? গাছের ডালে, বলল মা টুনটুনি। কেন গাছের ডালে কাক আসবে না? আসবে তবে চোখ কান খোলা রেখেই বাকি জীবন চলতে হবে বুঝলে? পরের দিন মা টুনটুনির সাথে ভয়ে ভয়ে বাসা ছাড়ল ছানা দুটো। আলতো ডানায় ওড়ে বেড়াচ্ছে শূন্য আকাশে আর গাছের এডাল ওড়ালে। তারা বেশ খুশি। সাহস করে নিজেরাও পোকা মাকড় শিকার করছে। আহ, কী আনন্দ। এর মাঝে ছানা দুটো আবার জড়োসড়ো হয়ে মায়ের ডানা তলে লুকিয়ে গেল। আবার কী হল? জানতে চায় মা টুনটুনি। মা-মণি ওই দেখো পুকুরে বাঁশের খুঁটিতে বসা দুটো চিকনা পঁচা কাক। আরে না, ওই দুটো কাক না। ওরা হল আমাদের বন্ধু পাখি ফিঙে। না, মা-মণি দেখো ওই দুটো চিকনা কাক বলে ওরা মাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে কাঁপছে। শোনো, ওরা সব সময় আমাদের এবং আমাদের ছানাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কোন পাখি কিংবা পাখির ছানা আক্রান্ত হলে ওরা তাৎক্ষণিক নিজ থেকে সাহায্য করতে এসে পড়ে। তাই আমরা ওদেরকে বলি পুলিশ পাখি। ওদের আসল নাম হল ফিঙে। মা-মণি তইলে ওদের কাকের মতো দেখাচ্ছে ক্যান? কাকের মতো দেখালেও ওরা কাক না। ওরা আমাদের বন্ধু ফিঙে। 

  মা আর ছানাদের কথা শুনে ফিঙে দুটোও এগিয়ে আসে আর টুনটুনি ছানাদের গাল ছুঁয়ে আদর করে দেয়। টুনটুনি ছানারাও ভয়কে জয় করে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে আর নিজেই নিজের আধার শিকার করে খাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ